বাবার শেষ কথা, ঢাকার রাস্তা অার কতদূর?

মে ০২, ২০১৭ ১১:০৫:অপরাহ্ণ

বাবা প্রত্যেক মানুষের মাথার ওপর ছায়ার মতো, বাবা এক পরম আশ্রয়—যাঁর হাত ধরে পাড়ি দেওয়া যায় দুস্তর পারাবার। বাবা মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক শক্তি আর সামাজিক পরিচয়। বাবাকে হারালে শুধু বাবার ভালোবাসা হারায় না, একসঙ্গে হারিয়ে যায় এই সবকিছুই।

বাবার অনেক স্বপ্ন ছিলো অামি যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাবো, সেখানে স্থায়ী হবো অনেক অনেক বড় হবো জীবনে। বাবার স্বপ্নের সাথে মিল রেখে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেই অামার বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সংগ্রাম। বাবার স্বপ্নের যুক্তরাষ্ট্র না হলেও বছরখানেক অাগে বাবার স্বপ্নগুলো নিয়ে অামার ডেনমার্ক যাত্রা। অনেক খুশি হয়েছিলেন বাবা-মা।

প্রবাসের প্রতিটা কষ্টের প্রহর অামি মেনে নিয়েছি শুধুমাত্র বাবার স্বপ্নগুলোকে সামনে রেখে। অামার অনেক কষ্ট হতো বাবা-মাকে ছাড়া একা থাকতে অামি সব মেনে নিয়েছি, মানিয়ে নিয়েছিলাম, কিন্তু বিদেশে অাসার এক বছর না যেতেই কেন অামার জীবনের গল্পটা এমন হয়ে গেলো। একুশ বছর বয়সেই যে পাহাড়সম যন্ত্রণা নিয়ে প্রবাসের জীবনটা অামার বিষিয়ে উঠবে কল্পনা করিনি। এইতো সেদিন ২০১৬ সালের জানুয়ারির ২৮ তারিখ বাবা অামাকে বিদায় দিতে এলেন। অামার হৃদয়ের ভাঙ্গচুর কেবল অামি টের পেয়েছি কাউকে বুঝতে দেইনি। বাবা অামাকে জড়িয়ে ধরে বললেন “ভালো থাকিস, নিজের যত্ন নিস! নতুন দেশ একটু সাবধানে চলাফেরা করিস”। এরপর কিছুদূর গিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাবা চোখ মুজছে। তখন অার কান্নাটা ভেতরে রাখতে পারিনি, মনে মনে কল্পনা করলাম, ফেরার সময় এয়ারপোর্টে অপেক্ষমান বাবাকে দূর থেকে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরবো, বাবা কত খুশি হবেন অামাকে দেখে, কল্পনায় বিদেশ থেকে ফিরছি মনে মনে নিজেই নিজেকে সান্তনা দিচ্ছিলাম। একসাথে অনেক কথা বলবো বাবাকে বিদেশের গল্প শুনাবো। কিন্তু কেন এমন হলো, বাবা অামার ফিরে অাসা পর্যন্তও অপেক্ষা করলেন না অভিমানী বাবা।

গেলো দুইটা ঈদের দিন অামি উপলব্ধি করেছি বাবা-মা’কে ছাড়া ঈদ পালন কত কষ্টের। সকাল থেকে মন খারাপ বাবাকে ফোন দিয়ে কান্না করছিলাম অার মনে মনে স্বপ্ন অাঁকছি পরের ঈদটা বাবা-মা’র সাথেই যেন করতে পারি। কিন্তু সে সৌভাগ্য অার অামার হয়নি একুশ বছর বয়সেই অামি পিতৃঅাদর শুন্য যুবক হয়ে গেলাম।

বাবা যখন অসুস্থ, ভীষণ জ্বর অামি ফোন করে কাঁদছিলাম। বাবা অামাকে ঝাড়ি দিয়ে বললেন “শুধু শুধু কান্না করিস অামার এমন কিছু হয়নি”
বাবা অসুস্থ অবস্থায় মা দুঃশ্চিন্তা করতেন বলে বাবা মা’কে বলতো “সে চায় অামি একদিনেই ভালো হয়ে যাই, মানুষের জ্বর হলে ভালো হতে তো দুদিন সময় লাগে”। যখন বাবা খুব অসুস্থ এ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার পথে সাথে মা সহ বাবা শুধু শেষ একটা কথা বলেছিলেন “অামরা কি কুমিল্লা পৌঁছেছি, ঢাকার রাস্তা অার কতদূর। এটাই বাবার শেষ কথা ছিলো।

হসপিটালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা জানালেন বাবার সম্পূর্ণ হার্ট ব্লক হয়ে গেছে, তিনটা হার্ট এ্যাটাক হয়েছে কিন্তু কেউ কিছু বুঝতেই পারেনি। জরুরি অাইসিইউ’তে নেয়ার ১০ মিনিট পরই বাবা চলে গেলেন। অার অামি বাবা ডাকার অধিকারটি হারিয়ে ফেললাম চিরতরে।

বড়ছেলে হিসেবে ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে অামার বোঝাপড়াটা দারুণ ছিলো। উনার বিশ্বাস ছিলো তাই অামার উপর ভরসা করেই বাবা নিজের স্বপ্নগুলো অামার কাছেই নির্দ্বিধায় বলতেন। এখানে অাসার পর প্রায়ই বলতেন “পাভেল তুই অামার বড়ছেলে অামার ছেলেদের তুই একটু দেখে রাখিস”। অামি বাবাকে হতাশ করতাম না, সবসময় বাবাকে সাহস দিতাম, বলতাম অাপনার ছেলে তার সারাজীবন উৎস্বর্গ করে হলেও অাপনার স্বপ্নগুলো সত্যি করবে। অামার দাদা ব্রিটিশ সিটিজেন ছিলো বাবা দাদার মেজ ছেলে, দাদার সব সন্তান ব্রিটিশ নাগরিক হলেও হতভাগ্য বাবা অামার বছরের পর বছর একা থেকেছেন, জীবনের সাথে সংগ্রাম করেছেন। কাউকে কখনো কিছু বুঝতে দিতেন না, কেউ কিছু বললে সাথে সাথে মন খারাপ করতেন না, দুঃখ থাকলে নিজের মধ্যে চেপে রাখতেন। নিজের মধ্যে রাখা অনেক কষ্টের কথা অামার সাথে বলতেন। অামি বলতাম বাবা অামিতো বড় হয়েছি অাপনার অার কোনও কষ্ট থাকবে না।
অামি বাবার স্বপ্নগুলোই অামার স্বপ্ন হিসেবে নিয়েছিলাম। অামার স্বপ্ন ছিলো বড় হয়ে সাংবাদিক হবো…কিন্তু বাবার এটা পছন্দ না তাই অামাকে জার্নালিজমে ভর্তি হতে দেননি। পরে বাবার স্বপ্নের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে অামার স্বপ্নগুলো ভুলেছিলাম। পুরোদমে বিদেশ পাড়ি দিলাম! এটা বাবার স্বপ্ন বাবার চাওয়া।

বাবা কোনও দিন কারো কাছে কিছু চাইতেন না। অামার দাদু ব্রিটেন হতে বাড়ি ফেরার সময় বাবাকে জিগ্যেস করতো তোর কিছু লাগবে কিনা তিনি সবসময় না বলতেন। কাছের এক অাত্মীয় দেশে যাবেন, মারা যাওয়ার ৫ দিন অাগে অামি বাবাকে জিগ্যেস করলাম! অাপনার জন্য কি পাঠাবো, বাবা জবাবে বললেন অামার জন্য একটা শার্ট কিনে দিস। অামি তো অবাক বাবা’কে কোনও দিন কারো কাছে কিছু চাইতে দেখলাম না, অথচ অাজ অামার কাছে বাবা শার্ট চাইলেন। মা’কে বললাম বিষয়টা, মা ও অবাক হলেন। মা পরে বললেন তুমি উনার ছেলে দেখে প্রথম তোমার কাছে চাইছে। অামার সেই অাত্মীয়কে ফোন দিয়ে বললাম বাবার জন্য শার্ট কিনতে হবে। অামার সেই অাত্মীয় মামা বললেন ঠিক অাছে অামি যাবার দুদিন অাগে দেখে একটা কিনবো। কি দূর্ভাগ্য অামার, বাবার অাবদারের শার্ট টা কেনার অাগেই বাবা অামাকে ছেড়ে চলে গেল। অামার একটা স্বপ্ন ছিলো অামি যখন টাকা কামানো শুরু করবো কষ্ট করে হলেও বাবার জন্য একটা গাড়ি কিনবো, বাবাকে গাড়ির সামনে বসিয়ে অামি ড্রাইভ করে বাবাকে এদিক ওদিক ঘুরাবো! অারেকটা স্বপ্ন ছিলো এমন যে অামার যখন মোটামুটি টাকা হাতে থাকবে অামি বাবা-মা’কে নিয়ে একসাথে হজ্ব পালন করবো। অাল্লাহ অামার মনের এই অাকাঙ্ক্ষাগুলো পরিপূর্ণ করলেন না। একবার বাবাকে তার বাবার জন্য খুব কাদঁতে দেখলাম, সেদিনই প্রথম বাবাকে প্রথম কাঁদতে দেখেছিলাম। অার অাজ অামি অামার বাবার জন্য কাঁদছি।

ছোটবেলায় পা ভেঙ্গেছিলাম একবার অামি দীর্ঘদিন হাঁটতে পারিনি, বাবা নতুন করে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন। প্রায় ছয় মাস সকালে ভোরে ভোরে উঠে অামাকে ধরে ধরে হাঁটানোর চেষ্টা করেছেন। অামার এখনো মনে পড়ে ছয় মাস পর যখন অামি হাঁটতে পেরে দৌড়ে বাবার কাছে গেলাম বাবার চোখে তখনও পানি দেখেছি।

নিয়তি কেন এমন হয়, যখন বাবার ছেলেরা বড় হচ্ছে স্বপ্নেরা ধরা দেয়া শুরু করবে তখনই বাবাকে হারাতে হলো। বড় অাপুকে বিয়ে দিবে বাবার সবথেকে বড় স্বপ্ন এটা, গ্রামের বাড়িটা নতুন করে সাজালেন, ঘর নতুন করে রঙালেন বড় মেয়ের বিয়ে দিবে কত অাশা তার। সৃষ্টিকর্তার কি হুকুম বাবা মারা যাওয়ার ঠিক এক মাস যেতেই বাবার বড়মেয়ের জন্য স্বপ্নের রাজকুমার হাজির, কিন্তু বাবা নেই। বড় মেয়েটার বিয়ে দেওয়ার হায়াতও অাল্লাহ বাবাকে দেননি।

অামি প্রতিটা মুহুর্তে কাঁদছি বাবা, তুমি নেই এখন অামি ঘুমাতে গেলে ঘুমাতে পারি না সেই যে ছোট্টবেলায় ঘুম পাড়িয়ে দিতে বিকেল বেলা জোর করে তোমার পাশে ঘুমাতে বলতে, বাবা অামাকে এখন অার কেউ কিছু বলে না, কোন স্বপ্নের কথা বলে না, খাওয়ার, ঘুমানোর কথা কেউ জিগ্যেস করে না, মা’কে অাড়াল করে কেউ অার বাড়তি খরচ করার জন্য টাকা দেয় না। ছোটবোনটাকে কেউ অাদর করে অার ময়না ডাকে না। ময়না অামাকে অভিযোগ দিয়েছে তুমি নাকি এখন অার ওকে চুল কাটাতে নিয়ে যাও না। অামাদের ছোট্ট ময়নাপাখিটা বাবাকে ঘরের কোথাও খুজেঁ পায় না। তুমি কোথাই বাবা অারেকটিবার অাসো না অামার মাথার উপরে বিশাল অাকাশ হয়ে। অাসো না বাবা অল্পক্ষণের জন্য.. একটিবার বাবা বলে ডাকি, অামার বাবা।

লেখক — নাঈম হাসান পাভেল, প্রবাসী শিক্ষার্থী।

Related Post