লক্ষ্মীপুরের ‘আতঙ্ক’, বিপ্লব রাষ্ট্রের কাছে ‘ভালো মানুষ’

জুন ১৮, ২০১৬ ১২:০৬:অপরাহ্ণ

biplob
নিজস্ব প্রতিবেদক:
লক্ষ্মীপুরের একসময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক ছিল তাহের পরিবার। লক্ষ্মীপুরের পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগের নেতা আবু তাহরের ছেলে বিপ্লব। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগের আমলে বাবা-ছেলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ওই এলাকার নাম হয় ‘সন্ত্রাসের জনপদ’।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রথম আমলে (১৯৯৬-২০০১) বিএনপির নেতা আইনজীবী নুরুল ইসলামসহ পাঁচটি হত্যা মামলা হয় বিপ্লবের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে একটি হত্যা মামলায় ফাঁসি, দুটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হয় বিপ্লবের।

আবার এই আওয়ামী লীগের আমলেই তাকে ফাঁসির দণ্ড মওকুফ করা হয়, সাজা কমানো হয় দুটি মামলার যাবজ্জীবন দণ্ডের।

ফাঁসির দণ্ড পাওয়া একাধিক হত্যা মামলার আসামি বিপ্লব দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে ২০১১ সালে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর থেকে কারাগারে আছেন। কারাগারে ঢোকার বছর তিনেকের মধ্যে ২০১৪ সালে এই কারাগারে বসেই বিয়ে করেন বিপ্লব। তার কারা-বিবাহ তখন দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছিল।

খবর চাউর হয়, কারগারে বসেই লক্ষ্মীপুরে নিজের সাম্রাজ্য দেখভাল করছেন বিপ্লব।

লক্ষ্মীপুরের ‘আতঙ্ক’ সেই বিপ্লব কারাগারে গিয়ে হয়ে গেছেন ‘ভালো মানুষের’ চূড়ান্ত। তাতে একজন কয়েদির জন্য রাষ্ট্রের যত ধরনের আনুকূল্য দেখানোর সুবিধা আছে, তার সবই দেয়া হয়েছে তাকে। ২০১১ সালে আত্মসমর্পণ করার পর প্রতিবছর গড়ে ১১০ দিন সাজা মাফ পেয়েছেন। এখন পর‌্যন্ত কারা কর্তৃপক্ষ ৫৪৯ দিন তাকে জেল রেয়াত দিয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। আবার নতুন করে ৬০ দিন সাজা মাফের জন্য সম্প্রতি কারা মহাপরিদর্শকের কাছে বিপ্লবের পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। সেটিও মঞ্জুর হয়ে যাবে বলে ইঙ্গিত মিলছে। আর তাতে নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগে মুক্তি পেতে পারেন ‘সৌভাগ্যের বরপুত্র’ বিপ্লব।

রাষ্ট্রের ‘অনুকূল্য’ পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ‘বিপ্লব’ নামের মাহাত্ম্য বাস্তব হয়ে উঠেছে তাহেরপুত্রের। রাষ্ট্রপতির ‘বিশেষ ক্ষমায়’ বিপ্লবের একটি হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড মওকুফ হয়েছে। দুটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজা আংশিক মওকুফ হয়েছে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকেই। রাষ্ট্রপতিরা এত কিছু করতে পারলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বসে থাকবে কেন। তাদের সুপারিশে একটি হত্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন বিপ্লব। এর বাইরে ভোগ করছেন ‘মানবিক’ দিক বিবেচনায় সাজা মাফ (জেল রেয়াত সুবিধা)।

আদালতের বিচারে সাজা পাওয়া, সাধারণ মানুষের কাছে একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও একাধিক হত্যা মামলার আসামির জন্য রাষ্ট্র আর কী করতে পারে!

বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, বিপ্লবকে যেসব সুবিধা এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, তার সবই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ভালো কাজের জন্য যত সুযোগ-সুবিধা আইনে বলা আছে, সবই এই আসামির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

আর এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এটা আমার এখনো ভালো করে জানা নেই। আগামীকাল জেনে এ নিয়ে কথা বলব।’

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিপ্লবের বিরুদ্ধে হওয়া পাঁচটি হত্যাসহ সব মামলাই বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলের (১৯৯৬-২০০১)। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১০ বছর তিনি পলাতক ছিলেন।

এর মধ্যে লক্ষ্মীপুরের বহুল আলোচিত আইনজীবী নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তার সেই সাজা মাফ করে দেন।

পরের বছর রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান কামাল ও মহসিন হত্যা মামলায় বিপ্লবের যাবজ্জীবন সাজা কমিয়ে ১০ বছর করেন। এরপর বাকি ছিল ফিরোজ হত্যা মামলা।

কিন্তু ২০১২ সালের নভেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির’ সুপারিশে সেই মামলা থেকেও বিপ্লবের নাম প্রত্যাহার করা হয়।

তার আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপর জাহেদ হত্যা ও এতিমখানায় অগ্নিসংযোগের মামলা থেকে বিপ্লবের নাম প্রত্যাহার করে নেয় রাষ্ট্রপক্ষ।

লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আদালতে তার (বিপ্লব) অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এখন ভালো সম্পর্ক থাকায় প্রশাসন তাদের পক্ষে কাজ করছে। অপরাধ থেকে মুক্তি পাচ্ছে বিপ্লব।’ একজন চিহ্নিত অপরাধী এভাবে সুবিধা পেলে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বলেও মন্তব্য করেন জেলা আওয়ামী লীগের এই নেতা।

অন্যদিকে বিপ্লবের বাবা লক্ষ্মীপুরের পৌর মেয়র আবু তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দিয়ে সাইফুল নামের একজন ফোন ধরেন। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, “স্যার এখন ঘুমাচ্ছেন।”
সূত্র: ঢাকা টাইমস

Related Post