সাবেক এমপি ইকবালের মাতাল ভাতিজার গাড়ি চাপায় শিশু হত্যা

অক্টোবর ১৪, ২০১৫ ০২:১০:অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
ডা. এইচবিএম ইকবাল বাংলাদেশের বহুল আলোচিত এক চরিত্র। তিনি সশস্ত্র ক্যাডারদের মিছিল বের করতেন, তিনিসহ ক্যাডাররা এলোপাথাড়ি গুলি চালাত। এমন ঘটনায় ২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চারজন নিহত হয়।

যদিও সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে ইকবাল অস্ত্র উঁচানো ক্যাডার পরিবেষ্টিত, তবে কিছুই হয়নি তার। ঘটনার নয় বছর পর আওয়ামী লীগর সরকার তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এমনকি তার সঙ্গে অস্ত্র উঁচানো শাওন সাংসদ হয়েছেন এবং সাংসদ হওয়ার পর তার হাতে খোদ যুবলীগেরই এক নেতা খুন হয়েছেন বলে নিহতের স্ত্রীর দাবি।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন ডা. ইকবালের ভাই এইচবিএম জাহিদুর রহমানের ১৬ বছর বয়সী ছেলে ফারিজ রহমান পিছিয়ে থাকবে কেন? সে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে রাস্তায় স্পোর্টস কার দিয়ে দুটি রিকশা চাপা দিয়েছে। একটি রিকশায় মায়ের কোলে ছিল দুই/তিন বছর বয়সী এক শিশু, ঘটনাস্থলেই সে মারা গেছে।

তবে চাচা যখন চার খুনে দায়মুক্তি পায়, তখন এক শিশু হত্যার জন্য পুলিশ ফারিজের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবে? তারা ফারিজ ও তার বন্ধুকে আটকের পর ছেড়ে দিয়েছে।

এমনকি নিহত শিশুটির লাশও ময়নাতদন্ত করা হয়নি। বরং শিশুটির পরিবারকে আপোষে বাধ্য করে লাশসহ বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। পুলিশ শিশু নিহতের কথা স্বীকার করলেও তার নাম পরিচয় গোপন রাখছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে ঢাকার গুলশানের ৭৪নং সড়কে ফারিজ রহমান ও তার বন্ধু কার রেসিং-এর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

এতে রিকশায় মায়ের কোলে থাকা আনুমানিক তিন-চার বছরের এক শিশু নিহত হয়। এ ছাড়াও আরেকটি রিকশাও গাড় চাপা পড়ে। দুই রিকশার মোট চারজন আহত হন।

আহতদের মধ্যে মোহাম্মদ রফিক (২৭) ও আবদুল হাকিম (৩২) নামে দুজনকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে রফিকের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।

এঘটনার পর ইকবালের ভাতিজা ফারিজকে তার টয়োটা ফরচুনার এসইউভি (ঢাকা মেট্রো ঘ ১১৮৯৭৬) গাড়িটিসহ আটক করা হয়। তবে ফারিজের পরিচয় জানার পর তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

গুলশান থানার এক এসআই বলেন, “ওই ছেলে (ফারিজ) মদ্যপ অবস্থায় ছিল। গুলশানের ৭৪ নম্বর সড়ক দিয়ে বেপরোয়া চালানোর সময় দুটি রিকশাকে ধাক্কা দেয়। এতে দুই রিকশাচালকসহ চারজন আহত হয়।”

এ ঘটনার পর পুলিশ ওই কিশোরকে আটক করলেও পরে ছেড়ে দেয় এবং দুর্ঘটনায় কোনো মামলাও হয়নি বলে জানান এই এসআই।

আটকের পর তাদের সঙ্গে ফারিজের কথা হয় জানিয়ে ওই এসআই বলেন, “চলন্ত অবস্থায় মোবাইলে ছবি তুলে ফেইসবুকে দেওয়ার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে ওই ছেলে আমাদের বলেছে।”

এদিকে ১৬ বছরের কিশোর বেআইনিভাবে মদ্যপান করে গাড়ি চালিয়ে এক শিশুকে হত্যা ও তিনজনকে আহত করলেও তাকে নির্দোষ বলে সাফাই গাইছেন গুলশান থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “ওই ছেলে (ফারিজ) গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ করেই একজন পথচারী সামনে পড়ে। তাকে বাঁচাতে গিয়েই এই দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা তারাই করেছে। গাড়িটি আটক রাখা হয়েছে, আর ওই ছেলেকে তার বাবার হেফাজতে দেওয়া হয়েছে।”

ফারিজের গাড়ি চাপায় এক শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে নিহত শিশুর লাশের ময়নাতদন্ত না করারও সাফাই গান ওসি। তিনি বলেন, “অভিভাবকরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিতে চাওয়ায় হস্তান্তর করা হয়েছে।”

ফারিজের গাড়ি দুর্ঘটনায় মামলা না হওয়ারও ব্যাপারেও গুলশান থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম দারুণ ব্যাখ্যা দিলেন, “যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এসব ঘটনায় কেউ যদি মারাও যায়, তবুও আসামি জামিন পেয়ে থাকেন”।

হয়তো দেশের আইনকানুনের দুর্বলতা সম্পর্কে ওসি ভালো জানেন অথবা তিনি ফারিজের পারিবারিক ইতিহাসের বিশেষ সচেতন।

ডা. এইচবিএম ইকবাল ১৯৯৬ সালে ঢাকার রমনা-তেজগাঁও আসনে আওয়ামী লীগের সাংসদ ছিলেন। মালিবাগের হরতাল বিরোধী বন্দুক মিছিলের ঘটনায় তিনিসহ ১৪ জনের নাম চার্জশিট দিয়েছিল পুলিশ।

তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ বিবেচনায় মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়।

এ বছর শুধু ইকবাল পরিবার ছাড়াও ক্ষমতাসীনদের অনেকেই খুশি মতো হত্যা বা গুলি চালানোতে জড়িয়ে পড়ছেন।

এর মধ্যে গত ১৩ এপ্রিল রাত পৌনে ২টার দিকে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে সামান্য যানজটে বিরক্ত হয়ে একটি কালো রঙের প্রাডো গাড়ি থেকে মাতাল অবস্থায় এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মহিলা সাংসদ পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনি। এতে অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

গত ৩ অক্টোবর শুক্রবার সকালে গাইবান্ধা-১ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন মদ্যপ অবস্থায় ডাক দিলে সাড়া না দেওয়ায় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভের পায়ে তিন রাউন্ড গুলি করেন।
সূত্র: অনলাইনবাংলা

Related Post