৪ বছরেও কোম্পানীগঞ্জের মিলন হত্যার বিচার হয়নি

জুলাই ১৫, ২০১৫ ০৬:০৭:পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

৪ বছরেও শেষ হয়নি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের মিলন হত্যার বিচার। কোম্পানীগঞ্জে ২০১১ সালের ২৭ জুলাই নোয়াখালী কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের সহায়তায় নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা ১৬ বছরের কিশোর সামছুদ্দিন মিলনকে। বিচার নিয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং স্থানীয় এমপি ওবায়দুল কাদের আশ্বাস দিলেও কোন অগ্রগতি হয়নি। 15

মিলনের  মা কহিনুর বেগমের অভিযোগ, এখন আমাদের কেউ খোজ নেই না। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগও পাইনা।

তিনি বলেন, আমার ছেলেকে প্রকাশ্যে হত্যার দৃশ্য টিভির পর্দায় দেখেছে সারা দেশের মানুষ। ভিডিওতে হত্যার দৃশ্য দেখা গেছে এরচেয়ে আর বড় কী প্রমান হতে পারে। আমাদের কাছের এরচে বড় কোনো প্রমান নেই। কিন্তু  ৪ বছরেও মামলা তদন্ত শেষ হলো না। বিচার পাবো কবে?  আলোচিত এই হত্যাকান্ডের তদন্ত শেষ না হওয়ায় একইভাবে হতাশা ব্যক্ত করেছেন মামলার আইজনজীবী গিয়াস উদ্দিন বাবুলও।
একই সাথে হত্যাকান্ডের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কোম্পানীগঞ্জ12 উপজেলার চরফকিরা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মিলনের পরিবারকে এক লাখ টাকা প্রদান এবং ন্যায় বিচারের আশ্বাস দেন। নিহত মিলনের ছোট ভাই সালা উদ্দিন পাভেলের লেখা পড়ার খরচসহ পরিবারের বরণ পোষন প্রদানের আশ্বাস দেন মন্ত্রী। কিন্তু গত ৪ বছরেও একবারের জন্যও মিলনের পরিবারের খোঁজ নেননি মন্ত্রী।

বিচার না হওয়ায় মিলনের পরিবার এবং স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে। তাছাড়া গ্রেফতারকৃত সাতজনও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত বাকীদেরও এখনো গ্রেফতার করা হয়নি। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার দাবি শীঘ্রই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
নিহত মিলনের পরিবার এবং পুলিশের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১১ সালের ২৭ জুলাই সকালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর কাঁকড়া ইউনিয়নের টেকের বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে প্রকাশ্যে পুলিশের সহযোগীতায় কিশোর সামছুদ্দিন মিলনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁর মা কহিনুর বেগম বাদী হয়ে ৩ আগষ্ট নোয়াখালীর আদালতে মামলা দায়ের করেন। ১১ আগষ্ট মামলাটি নোয়াখালী ডিবি পুলিশের স্থানান্তর হবার পর প্রথম দিকে ডিবি পুলিশ বেশ তৎপরতা দেখায়।
13 সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়, কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া গ্রামের আব্দুর রবের পুত্র শাহআলম (২০) নোয়াখালীর বিচারিক হাকিমের আদালতে নিজের জড়িত থাকাসহ ঘটনা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও প্রদান করেন। স্বীকারোক্তিতে হত্যাকান্ডে ১৯জনের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে শাহআলম। এছাড়া ভিডিও চিত্র দেখে মিলনকে পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমা ছাড়াও ২৯জনকে সনাক্ত করে ডিবি পুলিশ। পাশাপাশি পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে মিলনকে পিটিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করলেও কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে গ্রেফতারের সংখ্যা আর বাড়েনি, মামলার তদন্তের অগ্রগতিও এক পর্যায়ে থেমে যায়।

এদিকে হত্যাকান্ডের পরপরই তখনকার নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব রশিদ, সহকারি পুলিশ সুপার আলী হোসেন এবং নোয়াখালীর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিল্লাল হোসেনের সমন্বয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি হত্যাকান্ডে পুলিশের সহায়তার প্রমান পায়। অভিযোগ প্রমানিত হওযায় কোম্পানীগঞ্জ থানার তৎকালীন ওসি রফিক উল্যা, এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমা’র বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। বরখাস্ত করায় চার পুলিশ সদ্যস্যকে।
এনিয়ে ওসি রফিক উল্যাহর বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তরে এবং এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমা’র বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু পুলিশের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে কিশোর মিলনকে প্রকাশে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় সবার অগোচরেই। এমনিক তাদেরকে স্ব-স্ব পদে বহাল করে এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়।

 

https://www.youtube.com/watch?v=WBgrE8evW_8মিলন হত্যার ভিডিও

মিলন যেভাবে বর্বরতার শিকার-
ষোল বছরের কিশোর সামছুদ্দিন মিলন। প্রবাসী পিতার চার ছেলের মধ্যে সবার বড় সে। দুরসম্পর্কের খালাতো বোন চুমকিকে পছন্দ মিলনের। তাই ২০১১ সালের ২৭ জুলাই সকালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরফকিরা গ্রামের নিজবাড়ি থেকে ৫ কিলোমিটার দুরে চর কাঁকড়া ইউনিয়নের বেপারী স্কুলে পড়ুয়া চুমকিকে এক নজর দেখতে গিয়েছিলো। মিলন জানতো না ভোর থেকে এই এলাকায় ডাকাত সন্দেহে কয়েকজন গণপিটুনীতে মারা হয়েছে। এমনকি কিছুক্ষণ পরই গণপিটুনীর শিকার হয়ে মরতে হবে তাঁকেও ।
সকাল ৯টায় স্থানীয় লোকজন আটক করে মিলনকেও। উত্তেজিত জনতাকে খালাতো বোন চুমকির সাথে দেখা করতে এসেছে, একথা বলার পর তারা চুমকিকে বিদ্যালয় থেকে ডেকে এনে একথার প্রমানও পায়। তারপরও চলে মারধর। এক পর্যায়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিন এবং ইউপি সদস্যা ফেরদৌস আরা বেগম মায়ার স্বামী নিজাম উদ্দিন মানিকসহ স্থানীয় লোকজন খবর দিয়ে ডেকে এনে কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই আক্রাম উদ্দিন শেখের হাতে জীবত অবস্থায় তুলে দেওয়া হয় মিলনকে।
উদ্ধারের পর একই ইউনিয়নের টেকের বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে মিলনকে জনতার হাতে তুলে দেয় কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই আক্রাম উদ্দীন শেখ, কনষ্টেবল আব্দুর রহিম ও হেমা রঞ্জন চাকমা। সকাল সাড়ে ১০টায় পুলিশের লেলিয়ে দেওয়া উম্মত্ত বখাটেরা মধ্যযুগীয় কায়দায় নৃশংশভাবে পিটিয়ে হত্য করে মিলনকে। মৃত্যু নিশ্চিত হবার পর টেনে হেঁচড়ে পুলিশের গাড়িতে আবার তুলে দেওয়া হয় মিলনের লাশ।

Related Post